Requirements not met
Your browser does not meet the minimum requirements of this website. Though you can continue browsing, some features may not be available to you.
Browser unsupported
Please note that our site has been optimized for a modern browser environment. You are using »an unsupported or outdated software«. We recommend that you perform a free upgrade to any of the following alternatives:
Using a browser that does not meet the minimum requirements for this site will likely cause portions of the site not to function properly.
Your browser either has JavaScript turned off or does not support JavaScript.
If you are unsure how to enable JavaScript in your browser, please visit wikiHow's »How to Turn on Javascript in Internet Browsers«.
আন্তর্জাতিক
কন্যার সাফল্য ও একজন পিতার আত্মদর্শন
- Details
//দেলোয়ার জাহিদ//
জীবনের দীর্ঘ পথচলায় মানুষ অনেক পরিচয়ে পরিচিত হয়—শিক্ষক, লেখক, সংগঠক, সম্পাদক, সমাজকর্মী কিংবা কর্মজীবনের যোদ্ধা হিসেবে। কিন্তু সময়ের শেষ প্রান্তে এসে উপলব্ধি করি, এই সব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে যে পরিচয়টি সবচেয়ে গভীর, সবচেয়ে নীরব অথচ সবচেয়ে অর্থবহ, তা হলো—একজন পিতা হওয়া।
আশির দশক থেকে আমার জীবন নানা অভিজ্ঞতার বুননে গড়ে উঠেছে। বেসরকারি কলেজের শিক্ষকতা, সংবাদপত্র সম্পাদনা, সামাজিক সংগঠন পরিচালনা, স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ড—সব মিলিয়ে মানুষের জন্য কিছু করার এক নিরন্তর প্রয়াস ছিল আমার জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। কৈশোর ও যৌবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় কেটেছে কুমিল্লার একটি নিবন্ধিত সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে। শতাধিক শিশু, কিশোর ও যুবককে নিয়ে স্বেচ্ছাশ্রমে আমরা বহু সফল প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছি। তারও আগে, স্বাধীনতার মহান মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিক্ষেত্র পেরিয়ে আমি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে প্রবেশ করি। সেই জীবন আমাকে শিখিয়েছে সংগ্রাম, দায়িত্ব ও মানুষের প্রতি অঙ্গীকারের মূল্য।
কিন্তু আজ ফিরে তাকিয়ে দেখি, জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আমি পেয়েছি আমার সন্তানদের বড় হতে দেখার মধ্য দিয়ে।
এক সময় ছিল যখন আমি আমার কন্যা ইশরাত জাহান মৌমিকে বিভিন্ন সম্মেলন, সামাজিক অনুষ্ঠান, কর্মশালা কিংবা শিক্ষামূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে উৎসাহিত করতাম। কিন্তু সে ছিল নিজের জগতে নিবিষ্ট, নিজের স্বপ্ন ও ভাবনার পথে চলতে আগ্রহী। অনেক সময় মনে হতো, আমি যে মূল্যবোধ, যে অভিজ্ঞতা কিংবা যে শিক্ষা তাকে দিতে চাই, সেগুলো আদৌ তার ভেতরে কোনো বীজ রোপণ করতে পারছে কি না।
আজ বুঝি, সন্তানকে শেখানো মানে তাকে নিজের প্রতিচ্ছবি বানানো নয়; বরং তাকে তার নিজস্ব সত্তাকে আবিষ্কারের সুযোগ করে দেওয়া। প্রকৃত শিক্ষা কখনো চাপিয়ে দেওয়া যায় না—তা সময়ের গভীরে নীরবে অঙ্কুরিত হয়।
২০২৬ সালের ৫ জুন, অটোয়ায় অনুষ্ঠিত CASWE-ACFTS জাতীয় সম্মেলনে যখন আমার কন্যা ইশরাত কানাডার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত গবেষক, শিক্ষাবিদ ও পেশাজীবীদের সামনে তার গবেষণাপত্র উপস্থাপন করছিল, তখন আমি একজন দর্শক ছিলাম না; আমি যেন সময়ের এক দীর্ঘ যাত্রাপথের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার অপেক্ষায় ছিলাম ।
তার গবেষণার বিষয় ছিল—‘কোভিড-১৯ চলাকালীন অন্তরঙ্গ সঙ্গীর সহিংসতার শিকারদের সহায়তা: সমাজকর্মে আন্তঃসংযুক্ত ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা’। বিষয়টির গভীরতা আমাকে মুগ্ধ করেছে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি আমাকে স্পর্শ করেছে মানুষের প্রতি তার দায়বদ্ধতা, সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতি তার অঙ্গীকার এবং মানবিক মর্যাদার পক্ষে তার অবস্থান।
সেই মুহূর্তে আমার মনে হলো, জীবনের প্রকৃত সার্থকতা ব্যক্তিগত অর্জনে নয়; বরং পরবর্তী প্রজন্মের হাতে মানবতার মশালটি তুলে দিতে পারার মধ্যে নিহিত।
আমরা পিতামাতারা প্রায়ই ভাবি, আমাদের সন্তানদের আমরা গড়ে তুলি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে উপলব্ধি করি, আমরা কেবল মাটিকে প্রস্তুত করি; বীজের ভেতরে যে সম্ভাবনা নিহিত থাকে, তার বিকাশের নিজস্ব নিয়ম আছে। একটি বৃক্ষ যেমন নিজের সময়ে ফুল ফোটায়, তেমনি একটি সন্তানও নিজের সময়ে তার অন্তর্নিহিত শক্তির প্রকাশ ঘটায়।
একজন পিতা হিসেবে আমি কৃতজ্ঞ—মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে, যিনি তাকে পথ দেখিয়েছেন; সেই সমাজের কাছে, যা তাকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দিয়েছে; এবং সেই সব মানুষদের কাছে, যারা তার জীবনের যাত্রায় সঙ্গী ও সহায়ক হয়েছেন। বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ তার জীবনসঙ্গীর প্রতি, যার নীরব সমর্থন, ধৈর্য ও উৎসাহ তার অগ্রযাত্রাকে শক্তিশালী করেছে।
আমার কাছে এই সাফল্য কেবল একটি গবেষণাপত্র উপস্থাপনার ঘটনা নয়। এটি সময়, শিক্ষা, মূল্যবোধ, অধ্যবসায় এবং মানবিক চেতনার এক দীর্ঘ অভিযাত্রার প্রতীক।
আজ আমি বিশ্বাস করি, সন্তানের সাফল্যে একজন পিতার আনন্দ কেবল গর্বের আনন্দ নয়; এটি এক ধরনের আত্মদর্শন। সেখানে তিনি নিজের অসমাপ্ত স্বপ্নের পূরণ খোঁজেন না, বরং প্রত্যক্ষ করেন নতুন এক মানুষের বিকাশ, যে নিজের আলোয় আলোকিত।
আমার প্রার্থনা একটাই—সে যেন জ্ঞান অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে প্রজ্ঞা অর্জন করে, সাফল্যের সঙ্গে নম্রতা ধারণ করে এবং মানুষের সেবাকে জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখে। তার কর্ম যেন ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে, এবং সে যেন কখনো ভুলে না যায় যে মানুষের প্রতি সহমর্মিতাই সকল জ্ঞানের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য।
অবশেষে, জীবনের এই দীর্ঘ পথচলায় এসে আমি উপলব্ধি করি—একজন অভিভাবকের সবচেয়ে বড় পুরস্কার সন্তানের কত দূর যাওয়া নয়; বরং তাকে সেই মানুষ হিসেবে বিকশিত হতে দেখা, যার জন্য তার জন্ম হয়েছে।
সন্তান যখন নিজের আলোয় উদ্ভাসিত হয়, তখন পিতার হৃদয়ে যে প্রশান্তি জন্ম নেয়, তার কোনো ভাষা নেই। সেটি গর্বেরও ঊর্ধ্বে—সেটি এক নীরব কৃতজ্ঞতা, জীবনের প্রতি, সময়ের প্রতি এবং সৃষ্টিকর্তার প্রতি।
হরমুজ সংকটে ক্ষুধার ঝুঁকিতে কোটি কোটি মানুষ: জাতিসংঘ কর্মকর্তা
- Details
ঢাকা, ১১ মে, ২০২৬ (বাসস): পারস্য উপসাগরের কৌশলগত হরমুজ প্রণালী দিয়ে সার পরিবহন বন্ধ থাকলে কোটি কোটি মানুষ ক্ষুধা ও অনাহারের মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন জাতিসংঘের একটি টাস্কফোর্সের প্রধান।
সম্ভাব্য মানবিক সংকট ঠেকাতে কার্যরত এই কর্মকর্তা সোমবার এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় ইরান কয়েক মাস ধরে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি কার্যত নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। এই পথ দিয়ে বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ সার পরিবাহিত হয়, যা বিশ্বজুড়ে কৃষি উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জাতিসংঘের প্রকল্প পরিষেবা দপ্তরের নির্বাহী পরিচালক ও টাস্কফোর্স প্রধান জর্জ মোরেইরা দা সিলভা বলেন, ‘আমাদের সামনে কয়েক সপ্তাহ সময় আছে, না হলে একটি বিশাল মানবিক সংকট দেখা দিতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারি যেখানে আরও ৪৫ মিলিয়ন (৪ কোটি ৫০ লাখ) মানুষ ক্ষুধা ও অনাহারের ঝুঁকিতে পড়বে।’
জাতিসংঘ মহাসচিব মার্চ মাসে এই টাস্কফোর্স গঠন করেন, যার লক্ষ্য হরমুজ প্রণালী দিয়ে সার ও সংশ্লিষ্ট কাঁচামাল যেমন অ্যামোনিয়া, সালফার ও ইউরিয়া পরিবহনের একটি ব্যবস্থা চালু করা।
মোরেইরা দা সিলভা জানান, তিনি গত কয়েক সপ্তাহে সংঘর্ষে জড়িত পক্ষগুলোকে অন্তত কিছু জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিতে রাজি করানোর চেষ্টা করছেন এবং ইতোমধ্যে ১০০টিরও বেশি দেশের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
তিনি বলেন, ক্রমেই বেশি দেশ এই পরিকল্পনাকে সমর্থন জানাচ্ছে, তবে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং সার উৎপাদনকারী গুরুত্বপূর্ণ উপসাগরীয় দেশগুলো এখনো পুরোপুরি এতে সম্মত হয়নি।
তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদে লক্ষ্য হলো ‘স্থায়ী শান্তি’ চুক্তি এবং প্রণালীতে সব পণ্যের জন্য অবাধ চলাচল নিশ্চিত করা। তবে সমস্যা হলো, ‘কৃষি মৌসুম তো অপেক্ষায় থাকবে না, কিছু আফ্রিকান দেশে মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই মৌসুম শেষ হয়ে যাবে।’
বিশ্বজুড়ে এখন পর্যন্ত প্রধান মনোযোগ ছিল তেল ও গ্যাস বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হওয়ায় অর্থনৈতিক প্রভাবের দিকে। তবে জাতিসংঘ খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানাচ্ছে, কারণ আফ্রিকা ও এশিয়ার দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
মোরেইরা দা সিলভা বলেন, জাতিসংঘ সাত দিনের মধ্যে এই ব্যবস্থা চালু করতে পারে। তবে প্রণালি এখনই খুলে গেলেও স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ফিরতে তিন থেকে চার মাস সময় লাগবে।
তিনি বলেন, ‘এটা শুধু সময়ের ব্যাপার। যদি আমরা সংকটের মূল কারণ দ্রুত না থামাই, তাহলে আমাদের পরিণতি মোকাবিলা করতে হবে মানবিক সহায়তার মাধ্যমে।’
তিনি আরও বলেন, এখনো খাদ্যদ্রব্যের দাম ব্যাপকভাবে না বাড়লেও সারের দাম ইতোমধ্যে ‘বিপুলভাবে বেড়েছে’, যা কৃষি উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে এবং খাদ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে।
তিনি জানান, প্রতিদিন গড়ে মাত্র পাঁচটি সারবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করলেও সংকট ঠেকানো সম্ভব।
তার মতে, সবচেয়ে বড় অভাব হলো ‘রাজনৈতিক সদিচ্ছা’।
তিনি বলেন, আমরা দেরি করতে পারি না। এখন জরুরি হলো সার পরিবহন নিশ্চিত করা, যাতে বৈশ্বিক খাদ্য সংকটের ঝুঁকি কমানো যায়।
সীমান্তের কাঁটাতার, রাষ্ট্রের দেয়াল ও মানুষের মনস্তত্ত্ব: বিভাজনের রাজনীতি ও মানবিক সম্পর্কের দার্শনিক পাঠ
- Details
//দেলোয়ার জাহিদ//
পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী–এর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণে বিএসএফকে জমি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়–এর নেতৃত্বাধীন তৃণমূল সরকারকে পরাজিত করার পর নতুন সরকার দ্রুত এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, অবৈধ অনুপ্রবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারিতে কলকাতা হাইকোর্ট সীমান্তবর্তী নয়টি জেলায় বিএসএফকে জমি হস্তান্তরের নির্দেশ দিয়েছিল।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের এ সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় একই দিনে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির দৃঢ় ও আত্মবিশ্বাসী অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “বাংলাদেশের মানুষ কাঁটাতার ভয় পায় না, সরকারও ভয় পায় না।” এই বক্তব্য মূলত একটি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বার্তা—বাংলাদেশ সীমান্ত রাজনীতিকে ভয় বা চাপের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং সার্বভৌম মর্যাদা ও সমতার ভিত্তিতে দেখতে চায়। একই সঙ্গে এ প্রতিক্রিয়ায় একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক ইঙ্গিতও রয়েছে। কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলেও দুই দেশের মানুষের ঐতিহাসিক, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করা যায় না। ফলে এই বক্তব্য কেবল তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়; বরং বাংলাদেশের আত্মমর্যাদা, আঞ্চলিক কূটনৈতিক ভারসাম্য এবং সীমান্ত রাজনীতির প্রতি একটি প্রতীকী অবস্থান হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বলে, সীমান্ত রাষ্ট্রের অপরিহার্য উপাদান। কিন্তু মানবতাবাদী দর্শন মনে করিয়ে দেয়—মানুষ রাষ্ট্রের আগে এসেছে; তার ভাষা, সংস্কৃতি, স্মৃতি ও সম্পর্ক কোনও কাঁটাতারের যুক্তিতে সীমাবদ্ধ নয়। একটি সীমান্ত যখন গ্রামকে গ্রাম থেকে, পরিবারকে পরিবার থেকে, কিংবা ইতিহাসকে ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে, তখন সেখানে কেবল ভূখণ্ড ভাগ হয় না; ভাগ হয়ে যায় মানুষের আবেগ, বিশ্বাস ও পারস্পরিক আস্থা। কাঁটাতারের দু’পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ একই ভাষায় কথা বললেও রাষ্ট্রীয় রাজনীতির কারণে তারা ধীরে ধীরে “অপর” হয়ে ওঠে। এই “অপরীকরণ” (Othering) আধুনিক রাষ্ট্রনীতির অন্যতম গভীর মনস্তাত্ত্বিক সংকট।
বিশ্বের বহু সীমান্ত—Berlin Wall থেকে দক্ষিণ এশিয়ার বিভক্ত ভূখণ্ড—প্রমাণ করেছে, দেয়াল মানুষের চলাচল থামাতে পারে, কিন্তু মানুষের আকাঙ্ক্ষা, স্মৃতি ও সম্পর্ককে সম্পূর্ণ মুছে ফেলতে পারে না। বরং প্রতিটি কাঁটাতার মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, রাজনৈতিক বিভাজন যতই কঠোর হোক, মানবিক সংযোগ তার চেয়েও গভীর।
কাঁটাতারের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো—এটি স্মৃতিকে দ্বিখণ্ডিত করে। একই নদী, একই লোকসংস্কৃতি, একই পারিবারিক ইতিহাস দুই রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে গেলে মানুষের পরিচয়ও দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। ফলে জন্ম নেয় এক অন্তর্গত শূন্যতা। রাষ্ট্র হয়তো মানচিত্রে বিজয়ী হয়, কিন্তু মানুষ তার ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা হারায়। এই ক্ষরণ দৃশ্যমান নয়, কিন্তু তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের মনোজগতে বয়ে চলে।
বিভাজনের রাজনীতি সবসময় দেয়ালকে নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে। অথচ বাস্তবে দেয়াল যত উঁচু হয়, মানুষের মধ্যে অবিশ্বাসও তত গভীর হয়। দেয়াল রাষ্ট্রকে সাময়িক রাজনৈতিক সুবিধা দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা মানবিক সম্পর্কের ভিত্তিকে দুর্বল করে। কারণ দেয়াল মানুষের মধ্যে সংলাপ নয়, দূরত্ব তৈরি করে; সহাবস্থান নয়, বিচ্ছিন্নতাকে স্থায়ী করে। মানুষের সম্পর্ক ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, আত্মীয়তা ও পারস্পরিক নির্ভরতার ওপর গড়ে ওঠে। যখন একটি দেয়াল সেই স্বাভাবিক যোগাযোগকে বাধাগ্রস্ত করে, তখন ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে ভীতি, অবিশ্বাস ও মানসিক দূরত্ব জন্ম নেয়। অর্থাৎ দেয়াল কেবল ভূখণ্ড আলাদা করে না; এটি মানুষের আবেগ ও চেতনাকেও বিভক্ত করে।
“দেয়াল মানুষের মধ্যে সংলাপ নয়, দূরত্ব তৈরি করে”—এই বক্তব্যে সংলাপকে সভ্যতার মৌলিক মানবিক উপাদান হিসেবে দেখা হয়েছে। সংলাপ মানে পারস্পরিক বোঝাপড়া, সহমর্মিতা ও সহাবস্থানের সম্ভাবনা। দেয়াল সেই সম্ভাবনাকে সংকুচিত করে মানুষকে “অপর” হিসেবে দেখতে শেখায়। ফলে প্রতিবেশী মানুষ আর প্রতিবেশী থাকে না; তারা “অন্য রাষ্ট্রের মানুষ” বা “সম্ভাব্য হুমকি” হিসেবে চিহ্নিত হতে শুরু করে। এই মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনই বিভাজনের রাজনীতিকে দীর্ঘস্থায়ী করে।
দার্শনিকভাবে সীমান্তের কাঁটাতার এক ধরনের অস্তিত্ববাদী সংকটও তৈরি করে। মানুষ তখন প্রশ্ন করে—আমার পরিচয় কি কেবল একটি পাসপোর্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ? আমার ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও মানবিক সম্পর্ক কি রাষ্ট্রীয় নীতির চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর রাষ্ট্র অনেক সময় দিতে পারে না; কারণ রাষ্ট্রের যুক্তি ক্ষমতার, কিন্তু মানুষের যুক্তি স্মৃতি ও মানবিকতার। মিশেল ফুকো–এর “নজরদারি রাষ্ট্র” ধারণার আলোকে সীমান্ত যেন ক্ষমতার এক জীবন্ত প্রতিফলন। সীমান্তের দেয়াল কেবল মানুষকে থামায় না; এটি মানুষের মনে ভয়, সন্দেহ ও অনিশ্চয়তার সংস্কৃতি তৈরি করে। সীমান্তবাসী মানুষ প্রতিনিয়ত অনুভব করে যে তারা রাষ্ট্রের পূর্ণ নাগরিক নয়, বরং একটি “ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল”-এর অধিবাসী। ফলে সীমান্ত এক সময় ভৌগোলিক রেখা থেকে মানসিক কারাগারে রূপ নেয়।
অতএব, দেয়াল বা কাঁটাতারের বেড়া কেবল নিরাপত্তা অবকাঠামো নয়; এগুলো বিভাজনের রাজনীতি, মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব এবং মানবিক ক্ষরণের প্রতীক। রাষ্ট্র নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের ভাষায় দেয়াল নির্মাণ করে, কিন্তু মানবিকতা মানুষের মধ্যে সংযোগ, স্মৃতি ও সহমর্মিতার পক্ষে দাঁড়ায়। দেয়াল হয়তো সীমান্ত রক্ষা করতে পারে, কিন্তু তা মানুষের হৃদয়ের মধ্যে অদৃশ্য বিভাজনও তৈরি করে—যার ক্ষতি অনেক বেশি গভীর, দীর্ঘস্থায়ী এবং প্রজন্মান্তরে বহমান/
Ref: https://media.doinikekattorerchetona.com/bn/country-news/528-2026-05-11-21-58-53
দুই বাংলার ইতিহাস, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক জনতত্ত্ব ও ২০২৬-এর ভারতীয় নির্বাচন: গণতন্ত্র, পরিচয় ও পরিবর্তনের বহুমাত্রিক পাঠ
- Details
//দেলোয়ার জাহিদ//
বাংলার ইতিহাস কেবল ভৌগোলিক সীমারেখার ইতিহাস নয়; এটি স্মৃতি, উদ্বাস্তুতা, ভাষা, সংস্কৃতি, সংগ্রাম ও রাজনৈতিক চেতনার এক দীর্ঘ যাত্রা। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সেই ইতিহাসে এক গভীর বাঁক তৈরি করেছিল, যার প্রভাব পশ্চিমবঙ্গের সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক জনতত্ত্বে আজও প্রবলভাবে দৃশ্যমান।
আমার নিজের জীবনও সেই ইতিহাসের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে। ছাত্রজীবনের শুরুতে পশ্চিমবঙ্গই ছিল প্রথম বিদেশের মাটি, যেখানে আমি কোনো পরিচয়পত্র ছাড়াই সীমান্ত পেরিয়ে গিয়েছিলাম আশ্রয় ও মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণের সন্ধানে। ঢাকা জেলায় রায়পুরার নারায়ণপুর বাজার থেকে মেঘনা নদী পেরিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সংলগ্ন সীমান্তের পথে পৌঁছেছিলাম “নরশিংগড়” ক্যাম্পে। সেই অভিজ্ঞতা শুধু রাজনৈতিক চেতনা নয়, মানবিক ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গিকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালে সাংবাদিক হিসেবে Jyoti Basu, Buddhadeb Bhattacharjee এবং Nripen Chakraborty-এর মতো নেতাদের সাথে সাক্ষাৎ আলোচনা থেকে যে রাজনৈতিক আদর্শ, সরলতা ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার শিক্ষা পেয়েছি, তা আজও আমার চিন্তাজগতে গভীরভাবে প্রোথিত।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় বিপুল উদ্বাস্তু প্রবাহ পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী অঞ্চলের জনসংখ্যা, নগরায়ন ও ভোটব্যাংকের কাঠামোকে বদলে দেয়। উদ্বাস্তু রাজনীতি, বিশেষ করে হিন্দু উদ্বাস্তু ও মতুয়া সম্প্রদায়ের উত্থান, পরবর্তী সময়ে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। অন্যদিকে মুসলিম জনসংখ্যার পরিবর্তন, সীমান্ত রাজনীতি এবং নাগরিকত্ব প্রশ্ন ধীরে ধীরে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসে।
১৯৭৭ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত বামফ্রন্ট পশ্চিমবঙ্গে শ্রেণিভিত্তিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির একটি অনন্য মডেল গড়ে তুলেছিল। ভূমি সংস্কার, কৃষক ও শ্রমিক রাজনীতি এবং ধর্মনিরপেক্ষতা ছিল সেই রাজনীতির মূল ভিত্তি। কিন্তু দীর্ঘ শাসনের ফলে প্রাতিষ্ঠানিক জড়তা তৈরি হয় এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি নতুন বাস্তবতা হিসেবে আবির্ভূত হয়।
২০১১ সালে Mamata Banerjee-এর নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গে নতুন রাজনৈতিক যুগের সূচনা হয়। তৃণমূল কংগ্রেস সংখ্যালঘু ভোট, নারী ভোটার, গ্রামীণ দরিদ্র এবং বাংলা সাংস্কৃতিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে শক্তিশালী জনভিত্তি গড়ে তোলে। “বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়” ধরনের রাজনৈতিক ভাষ্য আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদকে নতুন শক্তি দেয়। একই সঙ্গে কন্যাশ্রী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ও স্বাস্থ্যসাথীর মতো কল্যাণমূলক প্রকল্প নারী ও নিম্নআয়ের মানুষের মধ্যে গভীর রাজনৈতিক প্রভাব সৃষ্টি করে।
অন্যদিকে ২০১৪ সালের পর BJP পশ্চিমবঙ্গে দ্রুত উত্থান ঘটায়। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA), সীমান্ত নিরাপত্তা, হিন্দু উদ্বাস্তু রাজনীতি ও জাতীয়তাবাদী আবেগকে সামনে এনে তারা পশ্চিমবঙ্গে নতুন ধরনের রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি করে। ফলে পশ্চিমবঙ্গের পুরোনো বাম-কংগ্রেস-তৃণমূল সমীকরণ বদলে গিয়ে “তৃণমূল বনাম বিজেপি” কেন্দ্রিক দ্বিমুখী বাস্তবতা তৈরি হয়।
২০২৬ সালের রাজ্য নির্বাচন আবারও দেখিয়েছে যে ভারতের গণতন্ত্র মূলত বহুমাত্রিক আঞ্চলিক বাস্তবতার সমষ্টি। West Bengal ও Tamil Nadu বিশেষভাবে দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক মডেল হিসেবে সামনে এসেছে। পশ্চিমবঙ্গ দেখিয়েছে সাংস্কৃতিক পরিচয়, কল্যাণনীতি ও আবেগভিত্তিক জনমুখী রাজনীতির শক্তি; অন্যদিকে Tamil Nadu উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার ও প্রশাসনিক দক্ষতার উপর ভিত্তি করে “ডেভেলপমেন্টাল ফেডারেলিজম”-এর সফল উদাহরণ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
আজকের পশ্চিমবঙ্গ আর কেবল শ্রেণিভিত্তিক বাম রাজনীতির রাজ্য নয়; এটি এখন পরিচয়, কল্যাণনীতি, ধর্মীয় মেরুকরণ, সীমান্ত রাজনীতি, নারী ভোটব্যাংক ও ডিজিটাল রাজনৈতিক প্রচারণার জটিল সমন্বয়ে গঠিত একটি রাজনৈতিক ভূখণ্ড। তবে গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই—জনগণ শেষ পর্যন্ত নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেয় এবং প্রয়োজন হলে সেই সিদ্ধান্ত সংশোধনও করে। ইতিহাস সাক্ষী, কোনো রাজনৈতিক শক্তিই চিরস্থায়ী নয়; কিন্তু মানুষের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা চিরন্তন। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক যাত্রা সেই চিরন্তন গণতান্ত্রিক অভিযাত্রারই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বাংলাদেশ সহ পৃথিবীর গণতন্ত্রমনা দেশগুলো এ বহুমুখী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক চর্চা থেকে শিক্ষা নিতে পারে।
- Additional Resources:
- Additional Resources:
- Agro-Ocean
- Bangabandhu Development and Research Institute
- Bangladesh North American Journalists Network
- Bangladesh Heritage and Ethnic Society of Alberta (BHESA)
- Coastal 19
- Delwar Jahid's Biography
- Diverse Edmonton
- Doinik Ekattorer Chetona
- Dr. Anwar Zahid
- Edmonton Oaths
- Mahinur Jahid Memorial Foundation (MJMF)
- Motherlanguage Day in Canada
- Samajkantha News
- Step to Humanity Bangladesh







